1. mizanurrahmanbadol2@gmail.com : Chaloman Shomoy : Chaloman Shomoy
  2. arasif1989@gmail.com : jony :
  3. mashiur2k@gmail.com : mashiur :
  4. trustit24@gmail.com : Admin panel : Admin panel
  5. chalomanshomoy@gmail.com : Polash News : Polash News
  6. info@chalomanshomoy.com : suvash :
শিল্পি মোহাম্মদ হাসেমঃ শ্রীকৃষ্ণপুর থেকে মানুষের হৃদয়পুরে - চলমান সময়
January 25, 2022, 7:36 am

শিল্পি মোহাম্মদ হাসেমঃ শ্রীকৃষ্ণপুর থেকে মানুষের হৃদয়পুরে

মশিউর রহমান মিঠু, বিশেষ প্রতিনিধি,চলমান সময়
  • আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২১
  • 54 Time View

স্মৃতিরা পোহায় রোদঃ

দৃশ্যপট-১: সত্তরের দশকের শেষ ভাগ। কবিরহাট কলেজে মামুনুর রশীদের -ওরা কদম আলী- নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। নাটকের মাঝামাঝি সময় একজন বিবেক একতারা হাতে মঞ্চে উঠে এলেন; গাইলেন একটি সহজিয়া জীবনশিক্ষা গান। অপরূপ ভঙ্গির গায়কীতে এবং সংগীতের মোহমায়ায় দর্কদের নিয়ে গেলেছে ভাবজগতের এক কল্পলোকে। তিনি শিল্পি মোঃ হাসেম। সুফিবাদী ধারার একজন সাধক মানুষ যেনো। গান শেষে ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে মিলিয়ে গেলেন। যেনো বা মিলিয়ে গেলেন ফানা-ফিল্লায়।

শিল্পি মোহাম্মদ হাসেম (১০.0১.১৯৪৭-২৩.০৩.২০২০)

দৃশ্যপট-২: শিল্পী মোঃ হাসেম এর গান আমি শৈশব-কৈশোরে শুনছিলাম ক্যাসেট প্লেয়ারে; তারপর শুনিনাই অনেক দিন। পরিচয়ও আমার সাথে জীবনে একবারই। নোয়াখালী সরকারী কলেজের একটা ক্যান্টিনে। তখন তিনি সদ্যঅবসরে। হয়তো বা অনুতোষিকের কাজে এসেছিলেন বোধহয়। বললাম, স্যার ছোলাবুট ভাজা খান। তিনি ইতস্তত করলেন; আমার মতি হলো স্যারকে আজ খাওয়াতে হবে। বললাম স্যার আমার বাড়ি কবিরহাট, আপনার কলেজের কাছে, আপনি আমার এলাকার অধ্যাপক ছিলেন। এবার স্যার গলে গেলেন। আনন্দের সাথে ছোলাবুট ভাজা খেলেন তিনি।

দৃশ্যপট  দুইটির দিকে একটু ফিরে দেখা যাক, শিল্পি মোঃ হাসেম তাঁর অন্তিম গানে “মাইজদী বড়দিঘীর হাড়েদি একদিন কবর দিও আঁরে” বলছেন, কবরে শুয়ে আমি মুয়াজ্জমের ভাঁইরে রাগ এর আজান শুনতে চাই,  বিজয় মঞ্চের  মুক্তিযুদ্ধের গান ও আলোচনা শুনতে চাই এবং শিল্পকলার অনুষ্ঠানের গান শুনতে চাই। আবার অপরদিকে দিকে তিনি সকলের কাছে দোয়া চান, যেনো কবর আজাব মাপ পেতে পারেন এবং হাশরের দিন ডান হাতে আমলনামা পেতে পারেন। মোল্লাতন্ত্রীগণ এ ধরণের কথায় গেলো গেলো রব তুলতে পারেন! গান-বাজনা করা লোকের তো কবর আজাব মাফ পাওয়ার কথা না; তারউপরে তিনি আবার কবরে শুয়ে গান শুনতে চান।

ধারণা করি, একমাত্র তাঁর সংগীতের প্রতি বিশ্বস্ত সুফিবাদী ধাবার মানুষের পক্ষে এধরণের যুগান্তকারী আশাবাদ পোষন করা সম্ভব।

বড়মেয়ের সাথে শিল্পি মোঃ হাসেম

মোঃ হাসেম এর এ গানটির আবেদন কবি নজরুলের অন্তিম ইচ্ছার গান“মসজিদের পাশে আমায় কবর দিও ভাই গানটির সাথে তুলনামূলক বিচারে আরো অনেক শৈল্পিক ও সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে।

আসুন গানটি পাঠ করি :

মাইজদী বড়দীঘির হাড়েদি একদিন করব দিও আঁরে

হুতি থাকুম কোট-কাছারীর দ্বারে দীঘির হাড়ে

হুতি হুতি বিজয়মঞ্চের গানগুন হুনুম বাইরে

কোর্ট মছিদে আজান দিবে ভাঁইরো রাগের হরে

হুনুম, মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা গান আর গল্প বাইরে॥

দক্ষিন হাড়ে বিজয়মঞ্চ আরও শহীদ মিনার

এই দুই জাগায় আছেরে ভাই বহুত স্মৃতি আঁর

বিশেষ দিনে বিজয়মঞ্চে শিল্পীরা গান গায়

আঁই নিজেও বিজয়মঞ্চে কত গান গাইছিরে॥

উত্তর হাড়ে নোয়াখালীর হববড় এক নেতা

হুতি রইছে মালেক উকিল বঙ্গবন্ধুর মিতা

হুব হাড়েতে শিল্পকলাত গান বাজনা হিঁয়ায়

কদিন, বাদে বাদে শিল্পকলাত গানের আসর অয়রে॥

নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান আছিল না আগে

কে লেখব গান সুর দিবো কে গায়বো কোন লোকে

একদিন যাত্রাকরি লেখছি গান সুরদি গাইছিলাম আঁইরে

লেখছি, আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্ট্রিক্ট ভাইরে॥

বেতার টিভি ক্যাসেট সিডিত হুনাইছিগো গান

বিজয়মঞ্চে উড়ি যখন গানে দিতাম টান

টানের লগে নাচি-কুদি চিল্লাইছ কি জোরে

তোমরা হেদিনের কথা কী হারিগেছ নিরে॥

থুই যাইতেছি নোয়াখাইল্লা শত শত গান

হুনি আঁরলাই দোয়া করবেন ভাই-বেরাদারগণ

রোজ হাশরে কবর আযাব মাপ যেনগো হাইরে

ডাইনহাত খানে হেদিন যেন আমলনামা হাইরে

মাইজদী বড়দীঘির হাড়েদি একদিন করব দিও আঁরে॥

[আঞ্চলিক শব্দের মান অর্থ: সাধারণত মান ভাষায় ব্যবহৃত অক্ষর প, স,শ ও ষ’এর  স্থলে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় সাধারণভাবে অক্ষর -হ’ ব্যবহৃত হয়। হাড়েদি=পাড়ের উপর, আঁরে=আমাকে, হুতি থাকুম=শুয়ে থাকবো,গানগুন=গানগুলো,হুনুম=শুনবো,মছিদে=মসজিদে,ভাঁইরোরাগ=ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভৈরবী গেত্রের একটি রাগ বিশেষ; আজানের সুর ভাঁইরো রাগে নির্মিত], আঁই=আমি,হববড়=সবচাইতে বড়,হুব-পূর্ব,হিঁয়ায়=শিখায়/শিক্ষা দেয়, হুনাইছি=শুনিয়েছিলাম হেদিনের=সেদিনের,হারি গেছনি=ভূলে গেছো নাকি, থুই যাইতেছি=রেখে যাচ্ছি।]

দ্বিতীয় দৃশ্যপটের দিক দেখলে বোঝা যাবে, শিল্পি মোঃ হাসেম কবিরহাট কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে যে সমস্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে তাঁর করিবহাট কলেজে অধ্যাপনা করার কথা বলা হলেও কখন থেকে তিনি কবিরহাট কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছেন এবং কখন শেষ করেছেন তার উল্লেখ নেই। সেখানে নোয়াখালী সরকারী কলেজের কথা আগে এসেছে। তারপর এসেছে লক্ষীপুর সরকারী কলেজের কথা এবং  একেবারে শেষে এসেছে কবিরহাট কলেজের কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিল্পি মোঃ হাসেম ঢাকার সংগীত কলেজের অধ্যায় শেষ করে মাটির টানে নোয়াখালী চলে এসে কবিরহাট কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এমনকি তখন কবিরহাট কলেজ সরকারীকরণ হয় নি। অধ্যাপনা জীবনের বেশিরভাগ সময় তার এ কলেজে কেটেছে।

শ্রীকৃষ্ণপুর থেকে মানুষের হৃদয়পুরে ঃ

নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের ভাষার প্রবাদপুরুষ শিল্পী মোঃ হাশেম এর গানে এমন কি আছে যা তাকে অঞ্চলের মনের মানুষের কাছে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা আর ভালোবাসায় অভিষিক্ত করেছে! এ বিষয়টি ভাবার আগে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, মোঃ হাশেম এর গানে কি নেই! আছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলবর্তী ও মেঘনাপাড়ের মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, রীতি-প্রথা, ভালো-মন্দ,শুভ-অশুভ, সংস্কার-কুসংস্কার,ঐচিত্য-অনঐচিত্য,নীতি-দুর্নীতি; এ সকলকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে শিল্পি মোঃ হাসেম এর গানে।

এক্ষনে আঞ্চলিক গানের এ প্রবাদপরুষ শিল্পী মোঃ হাশেম এর জীবনকোষ্ঠিতে আলোকপাত করা যাক, গীতিকার-সুরকার-গায়ক ও গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম ১৯৪৭ সালের ১০ জানুয়ারি নোয়াখালী সুধারাম থানার চরমটুয়া ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলে মাধ্যমিক পাস করে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সনদপ্রাপ্ত হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তার সঙ্গীত প্রতিভা জাতীয়ভাবে প্রকাশের সুযোগ ঘটে। সঙ্গীতেও তার উচ্চতর ডিগ্রি রয়েছে। লোকসঙ্গীত সম্রাট শিল্পী আবদুল আলীম তার সঙ্গীত গুরু। ঢাকা মিউজিক কলেজে সঙ্গীতে ডিগ্রি নেয়ার পর তিনি সেখানেই বাংলা বিভাগ ও সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু মাটির সংগীতের টানে তিনি ঢাকা শহরে স্থিত হতে পারেন নাই। চলে আসেন নিজভূম নোয়াখালীতে, জীবিকার জন্য তিনি শুরু করেন অধ্যাপনা। প্রথমে কবিরহাট কলেজ,পরে নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, লক্ষীপুর সরকারী কলেজ হয়ে আবার নোয়াখালী কলেক থেকে ২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এরও আগে ১৯৭০ সালে রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান সংগঠক’ হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন ২০২০ সালের ২৩মার্চ-তিনি মৃত্যূবরণ করেন। এই হলো শিল্পি অধ্যাপক মোঃ হাসেম এর ছোটখাটো জীবনন্তিকা।

কেমন করে একজন মানুষ বৃহত্তর একটি জনপদের মানুষের মনে-মনিকোঠায় জায়গা করে নিতে পাবেন! এ অঞ্চলের মানুষ খুব আঞ্চলপ্রিয় বলেই কী! এর মূলে কাজ করেছে শিল্পি মোঃ হাসেমের সহজিয়া বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি। জাত-পাত-সংস্কার ও সম্প্রদায়ের গন্ডিবব্ধ জীবন তাঁকে আবদ্ধ করে রাখতে পারেনি। প্রায় পাঁচ দশকের সঙ্গীত জীবনে তিনি বয়ে চলেছেন প্রবাহমান মেঘনার মতো। তবে প্রায় একা। এ অঞ্চলে তার যোগ্য সঙ্গী আর তেমন কেউ ছিলো না। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান বলে স্বতন্ত্র কিছুর অস্তিত্বও ছিলো না। ১৯৭৩-১৯৭৪ সালের দিকে মোহাম্মদ হাশেম নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় গান লিখতে শুরু করেন। তার হাত ধরেই এ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা, আনন্দ-বেদনা, মেঘনা পারের মানুষের সংগ্রামী জীবনাচার সঙ্গীতে রূপ নেয়। সাধারণভাবে নিম্নবিত্তের খেটে খাওয়া মানুষ যারা শিক্ষাবঞ্চিত, যাদের বৃত্তীয় জীবণের ভিতর গড়ে ওঠে আরেকটি উপ-ভাষা ও উপ-সংস্কৃতি সেটিকে তিনি অত্মস্থ করতে পেরেছেন সফলভাবে এবং তাদের ভাব ও ভাষায় গান রচনা করেছেন, সেইমতন সহজিয়া সুরারোপ করেছেন এবং একই লোকজ ঢংগে পরিবেশন করেছেন।

স্ব-ভূমে নিবিড় তুমি জন্মদিলা বিশ্বাসী সারসঃ

শিল্পি মোঃ হাসেম নোয়াখালীর নিজভূমের জন-মানবের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছে। তাঁর ছিলোনা তথাকথিত মান-গৌরব আর খ্যাতির মোহ। রেড়িও-টিভিতে যার গান বাজছে, গান বেজে চলেছে গ্রামোফোন রেকর্ডে কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ারে, এসব নিয়ে গর্ভকরে মানুষ থেকে নিজেকে আলাদাকরে সরিয়ে রাখার মানুষ তিনি ছিলেন না। তিনি যখন মঞ্চে গান গাইতে উঠতেন, প্রথমে সংলাপ করতেন সেই সব শ্রোতাদের সাথে, যারা নিম্নবৃত্তের,নিম্নবর্ণের, শিক্ষাবঞ্চিত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ; কেন না, তাঁর গানের বিষয় ছিলো এসকল মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরা। এ অঞ্চলের মানুষে জীবন নদীর মতো ভাঙ্গা-গড়া ও প্রবাহমানতায় ভরপুর। মানুষ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। এসব মানুষের জীবন ও সংগ্রাম তাঁর গানের প্রধান উপজীব্য হয়ে এসেছে ঘুরে-ফিরে। এ গানটি পড়লে খুব ভালোভাবে এটি উপলব্ধি করা যায় :

নোয়াখালীর দক্ষিণে দি উইটছে নোয়া চর

আরেককানা দক্ষিণে দি বঙ্গোপসাগর॥

ছোড ছোড ছনের ঘর আর বড্ডা খেরের হারা

গিরস্তেগো বৌয়ে ঝীয়ে রাইত অইলে দেয় বারা

নিশি রাইতে হুঁ হুঁ করি দরিয়াত আইয়ে হর॥

মস্তরামিয়া মন্তরামিয়া আছে নদী খাল

জোয়ার আইলে জাইল্লায় মারে ইলিশ মাছের জাল

তুলার বালিশ এক এক ইলিশ হানির মত ধর॥

বান-তুফানে হত্তই বছর কত মানুষ মরে

তওতো ঘর বানায় মানুষ নীরব নিঝুম চরে

নোয়া চরে নোয়া জীবন দেখতে কী সুন্দর॥

নোয়াখালীর দক্ষিণে দি উইটছে নোয়া চর

আরো এককানা দক্ষিণে দি বঙ্গোপসাগর॥

[আঞ্চলিক শব্দের মান অর্থ: নোয়া=নতুন,হর=সর/জোয়ার,গিরস্তেগো=গৃহস্থদের, ছোড=ছোট,বড্ডা=বড়, হারা=স্তুপ,হত্তই বছর=প্রতি বছর]

সহজিয়া পদ্যছন্দে চিত্রকল্প-মেটাফোর-টুইস্ট খেলা করেঃ

শিল্পি মোঃ হাসেম এর গানে আমরা দেখি তিনি সহজিয়া পদ্যছন্দে গানগুলো নির্মান করেছেন। প্রত্যেক গানেই পদ্যছন্দের অন্তমিলের প্রতি বিশেষ সজাগ ছিলেন। এটা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু তিনি যে তার গানের মাঝে অসংখ্য চিত্রকল্পের ব্যবহার তার গানকে আরো জীবন্ত আরো আকর্ষনীয় করেছেন এবার সেদিকে খানিকটা নজর দেয়া যায়।  “নোয়াখালীর দক্ষিণে দি উইটছে নোয়া চর” এ গানে তিনি লিখেছেন, “তুলার বালিশ এক এক ইলিশ” ইলিশ মাছকে তিনি তুলার বালিশের মত চিত্রিত করেছেন। বড় বড় ইলিশ মাছের আকার তো তুলার বালিশের মতোই! আমাদের অবচেতনের এ বোধটা হঠাৎ সজাগ হয়ে ওঠে।

“আংগো উত্তর বাড়ির তারা” এ গানে “তারার মুখের দিকে দেখতে লাগে জ্যৈষ্ঠ মাসের আম”

”আল্লায় দিছে বল্লার বাসা নোয়াখাইল্লা মাডি” এ গানে শিল্পি মোঃ হাসেম মেটাফোর বা রূপকের চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বল্লার বাসা” মানে হলো বোল্তার বাসা; বোল্তা দলবন্ধভাবে শত্রুকে আক্রমণ করে। নোয়াখালীর মানুষও তেমনি স্ব-ভাসী, স্ব-দেশী মানুষের বিপদে যে কোন অবস্থায় এগিয়ে আসে। “কোর্ট মছিদে আজান দিবে ভাঁইরো রাগের হরে” এ বাক্যবন্ধে চমৎকার টুইস্টে আমরা ধাক্কা খাই। আমরা যুগ-যুগান্তর ধরে মুয়াজ্জিমের আজান শুনে আসছি কিন্তু আমরা জানিনা যে,পাঁচ বেলার আজান “ভাঁইরো” রাগে নির্মিত। শিল্পি মোঃ হাসেম আমাদের জানান, প্রত্যেক সুরই তো কোন না কোন রাগ-রাগিনীর অন্তর্ভূক্ত; এসব রাগে আবেদন আছে, মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করার ক্ষমতা আছে। কাজেই ধর্মীয় প্রার্থনার সুরকে আমরা আড়াল করতে যাবো কেন!

উল্লেখ করা ভালো যে, শিল্পি মোঃ হাসেম নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান লেখেন নি বা নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানর শিল্পি তিনি ছিলেন না। বরং তিনি নোয়াখালী আঞ্চলিক ভাষার গান লেখেছিলেন এবং সুর দিয়ে গেয়েছিলেন। এটা পরিস্কার করা দরকার যে, তিনি কোন আঞ্চলিক মানুষ ছিলেন না। তিনি এ ভাষার গানের মাধ্যমে গোটা বাঙালদেশের মানুষের জীবনচিত্র উপস্থাপন করেছিলেন। কাজেই একটি আঞ্চলিক ভাষায় গান লেখলেই তাঁকে সে অঞ্চলের মানুষ হিসেবে গন্ডিবদ্ধ করা যায় না।  নোয়াখালীল আঞ্চলিক ভাষার গানের পাশাপাশি তিনি অসংখ্যা পল্লিগানও রচনা করেছিলেন এবং সুরারোপ করে গেয়েছিলেন। পুরো পল্লিবাংলার জীবনের স্রােতধারাকে উপলদ্ধি করতে না পারলে স্বার্থক পল্লিগান গান লেখা যায় না।

গ্রামীণ মানুষের সংকীর্ণতা স্বভাবদোশ শিল্পি মোঃ হাসেম এর দৃষ্টি এগায় নি। তা স্বার্থকভাবে উঠে এসেছে তাঁর এরকম একটা গানে :

বালা বালা ছালম রান্ধি কালার মায় খায়

কালার বৌ-গা বাড়িত আইলে বুগুলি টোকাই॥

কালা এক মায়ের একহুত,

হুতের বৌ-লই কালার মায় করে যে খুতখুত

বেদিশা অই কালার বৌগা বাপের বাড়ি যায়॥

বৌগা চেলিও হাইল্লায়

তও বুড়ি মাইয়াগারে হালুমদিন গাইল্লায়

এমন লক্ষী বৌ দি লোডে লোডে বারাও বান্ধায়॥

বালা বালা ছালম রান্ধি কালার মায় খায়

কালার বৌগা বাড়িত আইলে বুগুলি টোকাই॥

[আঞ্চলিক শব্দের মান অর্: বালা=ভালো,ছালম=তরকারী,বুগুলি=কলাগাছের ভিতরের শাঁস,চেলি হাইল্লায়=জ্বালানি কাট ফাঁড়ে,হালুমদিন গাইল্লায়=সারাদিন বকাঝকা করে,লোডে লোডে বারাও বান্ধায়=অনেক সময় ধরে ঢেঁকিতে ধান বানে]

 মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী কালে অনেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার চরম দারিদ্রতা অনেক সংকটে পড়েছে। আজীবন মুক্তি সংগ্রামের স্ব-পক্ষের মানুষ শিল্পি মোঃ হাসেম নিকট থেকে দেখেছেন এরকম এই মানুষগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা ও ওদের জীবনের করুণ পরিনতি। তা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর অনেক গানে। যেমন ঃ

আংগো উত্তর বাড়ির তারা

আড়ি আড়ি বড় লোকের বান্দে খালি বারা॥

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাপ গেছে তার মারা,

আড়ি আড়ি বড় লোকের বান্দে খালি বারা॥

তারার মা-ও বারা দিত তারাই খাইতো খুদ

অভাগিনী তারার মারঅ নাইরে ওগগা হুত

রোগে শোগে তারা মা-ও অইচে লারা লারা॥

তারা বানু বারা বান্দে টেবাই হড়ে ঘাম

মুখের দিকে দেখতে লাগে জ্যৈষ্ঠ মাসের আম

আম-গারে খাই মেলামারি হালাই দিব বারা॥

তারা বানু বারা বান্দে ঢেঁকিত মারে লাথি

আস্তে আস্তে নিভে যাইবো যৌবনেরও বাতি

একদিনও তো তারা বানু অইবো যৈবন হারা॥

আংগো উত্তর বাড়ির তারা

আড়ি আড়ি বড় লোকের বান্দে খালি বারা॥

[আঞ্চলিক শব্দের মান অর্থ : আড়ি আড়ি = হেঁটে হেঁটে,বারা=ধান বানা,ওগ্গা হুত = একটা ছেলে, লারা লারা = ক্ষীনকায়/দুর্বল, টেবাই হড়ে = ঝরে পড়ে,বারা=ধান বানা, মেলামারি হালাই দিব বারা =আম খেয়ে আঁটি ছুড়েফেলা হবে]

শিল্পি অধ্যাপক মোহাম্মদ হাসেম তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন যতদিন নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা থাকবে ততদিন, যতদিন বাঙলাভাষা থাকবে ততদিন #

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *