4.6 C
New York
Monday, December 1, 2025

৮১৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলা

ফারইস্টের সাবেক সিইও হেমায়েত উল্লাহ গ্রেফতার

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি। 

মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানী থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।  ডিবি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, হেমায়েত উল্যা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে চাকরি করার সময় কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও সাবেক পরিচালক এম এ খালেকের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ৮১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে একটি মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে ডিএমপির ডিবি বিভাগ তদন্ত করছে। ওই মামলায় তাকে আটক করা হয়েছে। আটকের পর ১৯ নভেম্বর (বুধবার) হেমায়েত উল্যাকে সিএমএম কোর্টে হাজির করা হলে আদালত তার জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করেন। এর আগে মো. হেমায়েত উল্যা দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে বলেও ডিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

উল্লেখ্য, শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত ৮শ’ ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় হেমায়েত উল্লাহ এজাহারভুক্ত আসামি।

বিমা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ভালো বিমা কোম্পানি হিসেবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিচিতি ছিল। ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ওপর করা এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসে, কোম্পানিটি থেকে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এর বাইরে অনিয়ম হয়েছে ৪৩২ কোটি টাকার। কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, এমএ খালেক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. হেমায়েত উল্লাহ এবং কোম্পানির কিছু শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটান।

যেভাবে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছিল :

বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি কেনা, বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ফারইস্টের মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিট (এমটিডিআর) বন্ধক রেখে পরিচালকদের ঋণ নেওয়া ও ক্ষতিকর বিনিয়োগ— মূলত এই তিন উপায়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চার বছরে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স ঢাকাসহ দেশের ১৪টি স্থানে জমি কেনে। এসব জমি কেনা হয় বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে। এর মধ্যে সাতটি জমি কেনা, ভবন নির্মাণ ও বালু ফেলার নামে ৬৬৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

মিরপুরের গোড়ান চটবাড়ির ৭৮৬ শতাংশ জমি ১৯৯ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে বলে হিসাবে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে এ জমি কেনা হয়েছে ১৯ কোটি টাকায়। ১৯৯ কোটি টাকার মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে চেকে দেওয়া হয়েছে ৬৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, কেডিসি কনস্ট্রাকশন ও মাহবুবা অ্যাসোসিয়েটকে চেকে দেওয়া হয়েছে ৪০ কোটি টাকা ও রেজিস্ট্রেশন খরচ বাবদ চেকে দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বাকি টাকা দেওয়া হয়েছে নগদে।

কোম্পানির ৭২ কাকরাইলের জমি কেনায় ১৬০ কোটি এবং গুলশান নর্থ অ্যাভিনিউয়ের জমি কেনায় ৮৯ কোটি, গুলশানের আরও দুই জমিতে ৮০ কোটি এবং বরিশালের আলেকান্দায় এক জমি কেনায় ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

যা ছিল দলিলে :

তিনটি দলিল সংগ্রহ করে দেখা গেছে, কাকরাইলের জমি কেনা হয়েছে নজরুল ইসলামের শ্বশুর মো. মফিজুল ইসলাম ও স্ত্রীর ভাই সেলিম মাহমুদের কাছ থেকে। জমি বিক্রির পর নজরুল ইসলামের স্ত্রী তাছলিমা ইসলামকে ১১৫ কোটি টাকা উপহার দেন মফিজুল ইসলাম ও সেলিম মাহমুদ। তাছলিমা ইসলাম আবার সেখান থেকে ৫০ কোটি টাকা উপহার দেন তাঁর স্বামী নজরুল ইসলামকে।

তোপখানা রোডের জমি কেনা হয়েছে নজরুল ইসলামের বন্ধু নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের দুই সহোদর মো. সোহেল খান ও মো. আজাহার খানের কাছ থেকে। আর মিরপুর চটবাড়ির নিচু এলাকার জমি কেনা হয়েছে ২০ জন বিক্রেতার কাছ থেকে। দলিলগুলোতে বলা হয়েছে, জমির মালিকদের টাকা দেওয়া হয়েছে নগদে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বিমা আইন অনুযায়ী, পাঁচ হাজার টাকার বেশি হলেই লেনদেন করতে হয় ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমটিডিআর বন্ধক রেখে ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের একাংশ। এর মধ্যে এমএ খালেক, প্রাইম প্রোপার্টি, প্রাইম ফাইন্যান্স, ম্যাকসন্স ও মিজানুর রহমানের নামে বন্ধক রেখে ৫৪২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারইস্টের এমটিডিআর বন্ধক রেখে প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির নামে ১৬৪ কোটি, পিএফআই প্রোপার্টিজের নামে ১৬০ কোটি, ফারইস্ট প্রোপার্টিজের নামে ১৫১ কোটি, প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের নামে ৯২ কোটি, মিথিলা প্রোপার্টিজের নামে ৬৪ কোটি, পিএফআই সিকিউরিটিজের নামে ৫৫ কোটি, মিথিলা টেক্সটাইলের নামে ৪৮ কোটি, কে এম খালেদের নামে ২১ কোটি, মোল্লা এন্টারপ্রাইজের নামে ২০ কোটি, আজাদ অটোমোবাইলসের নামে ৯ কোটি ও কামাল উদ্দিনের নামে ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিকর বিনিয়োগের মাধ্যমে ফারইস্ট লাইফের ২৮৭ কোটি টাকার তহবিল আত্মসাৎ করেন কোম্পানিটির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। এর মধ্যে বাংলালায়ন কনভার্টেবল জিরো কুপন বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে ১৪০ কোটি, পিএফআই সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে ১৩২ কোটি, প্রাইম ফিন্যান্সিয়াল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে বিনিয়োগের মাধ্যমে ১৪ কোটি, আল-ফারুক ব্যাগসে বিনিয়োগের মাধ্যমে ২ কোটি ও কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া ব্যাংক হিসাব দেখিয়ে ৮৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

চলমান সময়/২০নভেম্বর/পিএস

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যোগাযোগ রেখো

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

এ সম্পর্কিত খবর